শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ – এর পাঁচালী

 শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ – এর পাঁচালী স্তুতিঃ যন্ময়া ভক্তিযোগেন পত্রং পুষ্পং ফলং জলম্। নিবেদিতঞ্চ নৈবেদ্যং তদ্‌গৃহাণানুকম্পয়া ।। ত্বদীয়ং বস্তু গোবিন্দ তুভ্যমেব সমর্পয়ে। গৃহাণ সুমুখো ভুত্বা প্রসীদ পুরুষোত্তম।। মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং ভক্তিহীনং জনার্দ্দন। যৎ পূজিতং ময়া দেব পরিপূর্ণং তদস্তু মে।। অমোঘং পুণ্ডরীকাক্ষং নৃসিংহং দৈত্যসূদনম্। হৃষীকেশং জগন্নাথং, বাগীশং বরদায়কম্।। সগুণঞ্চ গুণাতীতং, গোবিন্দং গরুড়ধ্বজম্। জনার্দ্দনং জনানন্দং জানকীবল্লভং হরিম্।। প্রণমানি সদা ভক্ত্যা নারায়ণমতঃপরম্। দুর্গমে বিষমে ঘোরে, শত্রুণা পরিপীড়িতে।। নিস্তারয়তু সর্ব্বেষু তথানিষ্টভয়েষু চ। নামান্যেতানি সংকীর্ত্ত্য ঈপ্সিতং ফলমাপ্নুয়াৎ।। সত্যনারায়ণং দেবং বন্দেঽহং কামদংপ্রভুম্। লীলয়া বিততং বিশ্বং যেন তস্মৈ নমো নমঃ।।

 

 এই পাঁচালীটি ভক্তের নম্র নিবেদন—যে কিছু সামান্য দিয়েছেন তা ঈশ্বর গ্রহণ করুন—এবং তিনি বিভিন্ন রূপে (গোবিন্দ, নৃসিংহ, জগন্নাথ, হৃষীকেশ ইত্যাদি) দয়ার প্রতীক। মন্ত্রহীন, ক্রিয়াহীন বা অযোগ্য হলেও ভক্তি-নিবেদন গ্রহণযোগ্য—কারণ ভগবান গুণাতীত ও সর্বশক্তিমান। নামস্মরণ ও স্তবের মধ্য দিয়ে ভক্ত নিরাশা থেকে উদ্ধার, নির্দোষ আশীর্বাদ ও কাম্যফল লাভ-এর আশ্বাস পায়। শেষাংশে “লীলায় বিততো বিশ্ব” বলে ঈশ্বরের সার্বজনীন কার্যকে স্বীকৃতি দেয়—তাঁর প্রতি দিনাকর নমস্কার।

 

শব্দ-ভিত্তিক এবং যথাক্রমে পদ-ভাব ব্যাখ্যা

১) “যন্ময়া ভক্তিযোগেন পত্রং পুষ্পং ফলং জলম্।

নিবেদিতঞ্চ নৈবেদ্যং তদ্‌গৃহাণানুকম্পয়া ।।”

  • যন্ময়া ভক্তিযোগেন — আমার (যে) ভক্তি-যোগে (ভক্তির সম্পর্ক থেকে)

  • পত্রং পুষ্পং ফলং জলম্ — পাতা, ফুল, ফল, জল—সাধারণ উপহার বা নিবেদন।

  • নিবেদিতঞ্চ নৈবেদ্যং — এই নিবেদিত নৈবেদ্য (প্রস্তাবিত ভোগ)

  • তদ্ গৃহাণানুকম্পয়া — দয়া করে গ্রহন করুন।

ভাব: ভক্ত সরলভাবে যে সামান্য বস্তু উৎসর্গ করে—এসাব গ্রহণ করে তাদের প্রতি করুণানয়নের আবেদন। এখানে ভক্তি-ভাব সোজাসাপ্টা—ঈশ্বরকে যা আছে সেটাই দিলাম, তা গ্রহণ করুন; বড় অহং বা দাবি নেই—এই নম্রতা প্রধান।


২) “ত্বদীয়ং বস্তু গোবিন্দ তুভ্যমেব সমর্পয়ে।

গৃহাণ সুমুখো ভুত্বা প্রসীদ পুরুষোত্তম।।”

  • ত্বদীয়ং বস্তু গোবিন্দ — এ সকল তোমার, গোবিন্দ (গোবিন্দ = গো (গোপাল) + বিন্দু; রূপে পশ্চিম ভারতীয় ভক্তিলিপিতে ঈশ্বরের নাম)

  • তুভ্যমেব সমর্পয়ে — শুধুমাত্র তোর উদ্দেশ্যেই আমি এগুলো উৎসর্গ করছি।

  • গৃহাণ সুমুখো ভুত্বা প্রসীদ পুরুষোত্তম — সদয় মুখে গ্রহণ করো, পরম পুরুষ (Purushottama / সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি) — দয়া করো ও সন্তুষ্ট হও।

ভাব: ভক্ত আরও দৃঢ়ভাবে বলে: যে কিছু আমি দিচ্ছি তা তোমারই — নিকট অর্ঘ্য/নৈবেদ্য হিসেবে গ্রহণ করো, এবং ভক্তের মঙ্গল করে হাসির মুখে গ্রহণ করে আশীর্বাদ দাও।


৩) “মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং ভক্তিহীনং জনার্দ্দন।

যৎ পূজিতং ময়া দেব পরিপূর্ণং তদস্তু মে।।”

  • মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং ভক্তিহীনং — যদিও হয়তো আমার পুজোতে মন্ত্র নেই, ক্রিয়া (বহিরাগত আনুষ্ঠানিকতা) নেই, বা ভক্তি-প্রকাশও নগণ্য—

  • জনার্দ্দন — জনান্দ (লোকহিত) রূপে ঈশ্বরকে ধার্মিকভাবে সম্বোধন।

  • যৎ পূজিতং ময়া দেব পরিপূর্ণং তদস্তু মে — যা আমি (যতটুকু) ভগবানের উদ্দেশ্যে পূজেছি, সেটাই পরিপূর্ণ হোক; আমার আল্পতা notwithstanding, তা গ্রহণ করো।

ভাব: এখানে ভক্তি-ভাগ্যের বিনীত স্বীকার—“আমার উপকরণ অপ্রতুল, পদ্ধতি ধ্রুব নয়; তথাপি আপনার প্রতি নিবেদন পুরোদমে গ্রহণ করুন” — ঈশ্বরের করুণা-নিবেদন।


৪) “অমোঘং পুণ্ডরীকাক্ষং নৃসিংহং দৈত্যসূদনম্।

হৃষীকেশং জগन्नাথং, বাগীশং বরদায়কম্।।”

  • এই দুই পঙ্‌ক্তিতে ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপের উল্লেখ:

    • অমোঘং পুণ্ডরীকাক্ষং — অমোঘ (অপরাজেয়), পুণ্ডরীকাক্ষ (পদ্ম-চক্ষু — বিষ্ণুর রূপ; “পুণ্ডরীকাক্ষ” নামে ভগবানের সৌন্দর্য নির্দেশ)

    • নৃসিংহং দৈত্যসূদনম্ — নৃসিংহ (মানব-সিংহ রূপ; রক্ষা-কর্তা), দৈত্যসূদন (দুষ্ট রাক্ষস-বধকারী)

    • হৃষীকেশং — হৃষীকেশ = প্রাণকে বা হর্ষকে নিয়ন্ত্রণকারী, (কৃষ্ণ/বিষ্ণু নাম)

    • জগন্নাথং — জগন্নাথ = সমস্ত বিশ্ব-প্রভু (পরা-নারায়ণ)

    • বাগীশং বরদায়কম্ — বাগীশ (বাগীশ্বর? বাক্যভাগে — অস্ত্র/শক্তি-রূপ; বরদায়ক = লভ্যাদানকারী, আশীর্বাদদাতা)

ভাব: ভক্ত নানা রূপে ঈশ্বরকে স্মরণ করে, তাঁর রূপভেদের মাধ্যমে যে কোনো পরিস্থিতিতে সহায়তা পাবার বিশ্বস্ততা প্রকাশ পায় — সৌন্দর্য, রক্ষা, বিশ্ব-অধিষ্ঠাতা, দাতা—এগুলো মিলিয়ে ভক্তির আখ্যান সম্পূর্ণ হয়।


৫) “সগুণঞ্চ গুণাতীতং, গোবিন্দং গরুড়ধ্বজম্।

জনার্দ্দনং জনানন্দং জানকীবল্লভং হরিম্।।”

  • সগুণঞ্চ গুণাতীতং — ঈশ্বর সগুণ (সৃষ্টিগুণতাপন্ন) এবং গুণাতীত (সব গুণের অতিরিক্ত) উভয়রূপেই বিরাজ করেন। সাধারণত ঈশ্বরকে গুণাতীত বলা হয়—সে সমস্ত গুণের থেকেও উচ্চ।

  • গোবিন্দং গরুড়ধ্বজম্ — গোবিন্দ এবং যাঁর ধ্বজায় ‘গরুড়’ আছে — গরুড়ধ্বজ = বিষ্ণুর প্রতিচিহ্ন।

  • জনার্দ্দনং জনানন্দং জানকীবল্লভং হরিম্ — জনার্দন (লোক-রক্ষক), জনানন্দ (লোকদের আনন্দদায়ক), জানকীবল্লভ (সীতার আরাধ্য: রাম-প্রসঙ্গ/জ্ঞানকীর্তন?) — এখানে ভক্ত ভগবানের রাম-রূপকেও স্মরণ করে (Janaki-bhalla-v = জানকীর প্রিয় — রাম), হরিম্ = হরি (বিষ্ণু)।

ভাব: ঈশ্বর একাদিক রূপে আমাদের কাছে উপস্থিত—জ্ঞান ও অনুকম্পা, রক্ষা ও প্রেম। ভক্ত সব রূপে তাঁকে স্মরণ করে।


৬) “প্রণমানি সদা ভক্ত্যা নারায়ণমতঃপরম্।

দুর্গমে বিষমে ঘোরে, শত্রুণা পরিপীড়িতে।।”

  • প্রণমানি সদা ভক্ত্যা — আমি সদা নম্রভাবে ভক্তিভরে প্রণাম করি—নিরন্তর শ্রদ্ধা।

  • নারায়ণমতঃপরম্ — নারায়ণরূপে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধেয় — সর্বোত্তম।

  • দুর্গমে বিষমে ঘোরে, শত্রুণা পরিপীড়িতে — দুর্যোগ, বিপদ, শত্রু-চাপ—এইসব কঠোর অবস্থায় ঈশ্বর মুক্তি দান করবেন; অর্থাৎ বিপদাপদে আশ্রয়।

ভাব: ভক্তের মর্ম এখানে—নিরন্তর শ্রদ্ধায় অধিষ্ঠিত থেকে বিপদের কালে নারায়ণের আশীর্বাদ প্রত্যাশা করা।


৭) “নিস্তারয়তু সর্ব্বেষু তথানিষ্টভয়েষু চ।

নামান্যেতানি সংকীর্ত্ত্য ঈপ্সিতং ফলমাপ্নুয়াৎ।।”

  • নিস্তারয়তু সর্ব্বেষু — মুক্তি দাও সকলের (সব দুঃখ ও শঙ্কা কমিয়ে দাও)।

  • তথা-নিষ্টভয়েষু চ — এবং সেই নিষ্ঠ (অধিষ্ঠিত) ভয়গুলো (ভক্তদের স্থির ভয়/ভক্তির সংশয় ইত্যাদি) থেকেও রক্ষা করো।

  • নামান্যেতানি সংকীর্ত্য — আমি এই নামগুলো (তুমি-তুমি নাম: নারায়ণ, গোবিন্দ ইত্যাদি) স্তব করলাম ও জাপ করলাম।

  • ঈপ্সিতং ফলমাপ্নুয়াৎ — যে বর কামনা করি, সেই ফল আমি পাই—ইচ্ছিত ফল প্রার্থনা।

ভাব: নামস্মরণ ও স্তবের মাধ্যমে ভক্ত আশাবাদী—নামে শরণ হলে ভক্তি, নিরাময় ও ইচ্ছা পূরণ হয়।


৮) “সত্যনারায়ণং দেবং বন্দে'হং কামদংপ্রভুম্।

লীলয়া বিততং বিশ্বং যেন তস্মৈ নমো নমঃ।।”

  • সত্যনারায়ণং দেবং বন্দে'হং — আমি সত্যনারায়ণ দেবকে বন্দনা করি। (সত্য-নারায়ণ = সত্যাবতার / পরমসত্যরূপ)

  • কামদং প্রভুম্ — কামদ = কামপূরণকারী প্রভু (বাস্তবতায় কামদেবের অর্থ এখানে ঈশ্বর-যিনি ইচ্ছা পূরণ করেন)

  • লীলয়া বিততং বিশ্বং — তার লীলায় (খেলায়/চালনায়) সমগ্র বিশ্ব ছড়িয়ে রয়েছে—ঈশ্বরের কার্যধারা বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে।

  • তস্মৈ নমো নমঃ — তিনি-ই শ্রদ্ধার যোগ্য; নতজানু হওয়া। বার বার নমস্কার।

শেষ ভাব: ভগবানের সর্বব্যাপিতা, কামপূরণশক্তি ও লীলার মহিমান্বিত দর্শন — সবার প্রতি নমো নমঃ।


ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক দিকশিক্ষা (আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা বা ভিডিওতে তুলতে পারেন)

  1. ভাষ্য-রীতি: প্রতি স্তবক পড়ে বাংলা অনুবাদ বলুন — প্রথমে অলঙ্কারহীন সরল অনুবাদ, পরে শব্দ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা দিন (যেমন উপরে)। দর্শক অনুধাবন সহজ হবে।

  2. প্রতিটি নামের ব্যাখ্যা: (গোবিন্দ/জনার্দন/নৃসিংহ/জগন্নাথ ইত্যাদি) — ঐতিহাসিক/পৌরাণিক প্রসঙ্গ এক-দুই লাইনে উল্লেখ করলে শ্রোতা আকর্ষিত হবে।

  3. আচরণ/চর্চা পরামর্শ:

    • প্রতিদিন যুগপৎ ১১ বার বা ১০৮ বার এই নামগুলো ধীরগতি নিয়ে উচ্চারণ করলে ভক্তি–উষায় আগবে।

    • নিবেদনের সময় সোজা মন—পশ্চিমে বা মূর্তির সামনে ছোটে পুষ্প, ফল, বা জলের অঞ্জলি দিয়ে করা যায়।

  4. চ্যানেল/ভিডিও আইডিয়া: প্রতিটি শ্লোককে আলাদা ক্লিপ করুন — প্রতিটির শেষে “আজকের অনুশীলন” অংশ রাখুন (২–৩ মিনিট) যাতে দর্শক সহজে মর্ম উপলব্ধি করে।

  5. ভিজ্যুয়াল-সাজেশন: পটভূমিতে মৃদু মন্ত্র-সুর বা সিতার/তরাব/তানপুরার মৃদু তাল; প্রতিটি দেবতার নাম উচ্চারণের সময় ঐ রূপের ছায়াচিত্র, রথযাত্রার ভিডিও (জগন্নাথ) বা নৃসিংহ-অভিসার কল্পচিত্র ব্যবহার করুন।

  6. আচরণগত নীতি: পাঠের সাথে পাঠকের জন্য ছোট “প্রতিজ্ঞান” দিন — যেমন: “আজকের দিন—একটি সামান্য দান করবো” বা “একটি ছোট পরিচ্ছন্নতা কাজ করবো” — যা স্তবকটির দান-প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত রূপায়নে সহায়ক।


সংক্ষিপ্ত সারমর্ম (১০০ শব্দে)

এই পাঁচালীটি ভক্তের নম্র নিবেদন—যে কিছু সামান্য দিয়েছেন তা ঈশ্বর গ্রহণ করুন—এবং তিনি বিভিন্ন রূপে (গোবিন্দ, নৃসিংহ, জগন্নাথ, হৃষীকেশ ইত্যাদি) দয়ার প্রতীক। মন্ত্রহীন, ক্রিয়াহীন বা অযোগ্য হলেও ভক্তি-নিবেদন গ্রহণযোগ্য—কারণ ভগবান গুণাতীত ও সর্বশক্তিমান। নামস্মরণ ও স্তবের মধ্য দিয়ে ভক্ত নিরাশা থেকে উদ্ধার, নির্দোষ আশীর্বাদ ও কাম্যফল লাভ-এর আশ্বাস পায়। শেষাংশে “লীলায় বিততো বিশ্ব” বলে ঈশ্বরের সার্বজনীন কার্যকে স্বীকৃতি দেয়—তাঁর প্রতি দিনাকর নমস্কার।

Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel) on নভেম্বর ১৫, ২০২৫ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.